পর্নো আসক্তি থেকে মুক্তির উপায়...

Comments · 15 Views

পর্নোগ্রাফি কে না বলুন।

আমি ২০১৪ সাল থেকে ২০২২ এর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত প্রথম দিকে হস্তমৈথুন এর পরে পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ি আমার এক বন্ধু সুলভ বাগিনার সাথে থাকার কারনে এই সমস্যায় আমাকে পড়তে হয়, আমি দোয়া করি আল্লাহ পাক তাকে হেদায়েত দান করুক। প্রথম দিকে আমি দিনে একবার অথবা সপ্তাহে দুই বা তিনবার হস্তমৈথুন করতাম, তখন পর্নোগ্রাফি দেখতাম না কারণ আমার কাছে মোবাইল ছিল না। 

 

আমি খুব ভালো Cricket খেলতাম, কিন্তু যখন আমি এই রোগে আক্রান্ত হলাম, তখন দেখলাম আমার আর খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে গেছে আস্তে আস্তে আমি মাঠ থেকে দূরে সরে গেছি, আমার বন্ধুরা আমাকে আর ডাকে না খেলার মাঠে। 

 

এইভাবে হস্তমৈথুন করার মাধ্যমে চলতে থাকলো আমার দিন, প্রথম প্রথম ভালো লাগতো একটা সময় আর ভালো লাগে না, এই জগত থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম, আমি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় না করতে পারলেও ৩ থেকে ৪ ওয়াক্ত নামাজ পড়তাম । কারণ আমার পরিবারের সবাই নামাজ পড়তো তাই আমাকে পড়তে হতো। সেই সুবাদে এলাকার সবাইর চোখে আমি আইডল ছিলাম, কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমি দিন দিন পশুতে পরিণত হতে যাচ্ছি এই খবর কে রাখে, সারাদিন আমার মাথায় আজেবাজে চিন্তা ঘুরতো নিকট আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে, মাঝে মাঝে আমি রুমে একা বসলে কান্না আসতো, নিজেকে নিজের কাছছ একটি পশু বলে মনে হতো। আমার জীবনের প্রতি আমার বিরক্ত চলে আসছে, আমার ইচ্ছা হারিয়ে গেছে বেঁচে থাকার। 

 

এইভাবে চলতে থাকলো আমার জীবন এর মধ্যে আমার SSC রেজাল্ট প্রকাশ করা হলো আমি এতো বাজে রেজাল্ট করলাম, আমার পরিবার ও সমাজ এটা মেনে নিতে পারলো না। নিজেকে মেরে ফেলতে ইচ্ছা করছিলো, তবুও কেন বেঁচে ছিলাম জানিনা আল্লাহ জানতো আমাকে একদিন হেদায়েত দান করবেন তাই বেঁচে আছি। 

 

তারপর শুরু হলো আমার কলেজ জীবন যা পূর্বের জীবন থেকে আরো বড় আজাব। কারণ তখন আমার হাতে এসে পড়ে স্মাট ফোন, আমি তখন হস্তমৈথুনের জগত থেকে বেরিয়ে পর্নোগ্রাফির জগতে হারিয়ে যাই। তখন আমার বন্ধুরা নিয়মিত কলেজে যেত কেউ কেউ প্রেম করতো, আমি তেমন একটা কলেজে যেতাম না আমি সারাদিন ঘরে বসে South Indian Movie, আর Hollywood ও Bollywood আর ওয়েব সিরিজ দেখতাম দিনের বেলায়, আর রাত হলে পর্নোগ্রাফির জগতে হারিয়ে যেতাম। সকালে ১০ টা কখনো ১১ টায় ঘুম থেকে উঠতাম বন্ধুরা কল দিতো কলেজে যাওয়ার জন্য আমি যেতাম না। আমার নিয়মিত অভ্যাস হয়ে গেছে রাত ৩ টা অথবা ৪ টায় ঘুমানো, সকালে ঘুম থেকে উঠলে আব্বু বকাঝকা করতো পড়া লিখা করিস না কলেজে যাস না আমার মেজাজ সবসময় খিতখিতে থাকতো, বাইরে সবার সাথে ভালো ব্যবহার করলেও আমি পরিবারের সাথে বাজে ব্যবহার করতাম, কারণ আমার চিন্তা ভাবনায় দিন দিন পর্নোগ্রাফির জগতের গভীরে প্রবেশ করছিলাম। 

 

এইভাবে চলতে থাকে আমার জীবন এই মধ্যেই আমার HSC পরীক্ষা হাজির তখনও আমি এই জগত থেকে বের হতে পারলাম না পরীক্ষার রেজাল্ট দিলো আমি আগের চেয়ে আরো খারাপ রেজাল্ট করলাম। আমার এই অবস্থা দেখে আমার পরিবার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আমাকে বিদেশ পাঠিয়ে দিবে কারণ আমাকে দিয়ে আর পড়ালেখা হবে না কিন্তু তারা কখনো জানতেও চায়নি কেন আমি এরকম হয়ে গেলাম। তারপর Covid-19 করোনা ভাইরাস এসে হাজির আমার আর বিদেশ যাওয়া হলো না, তাই রেজাল্ট খারাপ হওয়ার কারণে আমি সরকারি কোন কলেজে অর্নাসে কোন Subject পাইনি। তাই ব্যর্থ হয়ে Private একটা কলেজে একটি ভালো Subject এ ভর্তি হই। আর এখন হলে আমি অর্নাসের জন্য Apply ও করতে পারতাম না এতো বাজে রেজাল্ট ছিল আমার। 

 

যাইহোক ভর্তি হলাম অর্নাসে ভালো একটা সাবজেক্ট নিয়ে প্রথম দিকে সিদ্ধান্ত নিলাম ভালো ভাবে পড়াশুনা করবো, কয়েকদিন ভালো ভাবে পড়াশুনাও করলাম। কিন্তু পড়া মনে রাখতে পারতাম না পড়তে বসলে আজে বাজে চিন্তা আসতো মাথার মধ্যে, আমি যতই খারাপ কাজ করতাম কিন্তু যথা সম্ভব চেষ্টা করতাম নামাজ পড়তে, যতই আল্লাহর কাছে তওবা করতাম ভেঙ্গে ফেলতাম, আবার সেই পুরোনো কাজে জড়িয়ে যেতাম। এভাবে এভাবে দেখতে দেখতে আমার ১ম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা চলে আসে, কিন্তু অতিরিক্ত পর্নোগ্রাফি দেখার কারণে আমি পড়া মুখস্থ রাখতে পারতাম তাই এক বিষয় ফেল করি। তবে ২য় বর্ষে Promote হয়ে যাই, কিন্তু আমি নিজেকে এই পাপ থেকে বিরত রাখতে পারতাম, আমার পাপের ধারা অব্যাহত থাকলো, যতই তওবা করতাম আবার ভঙ্গ করে ফেলতাম, এই দিকে আমার বন্ধু বান্ধব অনেক জন বিদেশ গিয়ে ভালো টাকা পয়সা কামিয়ে বিয়ে করে ফেলতেছে। এইসব দেখে আমার ক্যারিয়ার নিয়ে দুচিন্তা হতো পায়, কিন্তু আমি কাউকে বলতাম আমার ভিতর কতো কষ্ট জমে আছে, রাত আসলে আমার ভয় লাগতো না চাইতেও আমি নিজেকে এই পাপ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারতাম না ।

 

এইভাবে করে আমি আমার জীবনের ৮ টি বছর কাটিয়ে দিয়েছি এই পাপের জগতে, এর মধ্যে আমার জীবনে একটি ঘটনা ঘটে। একদিন সকালে আমার মোবাইলে কল আসে, আমার নানু মারা গেছে। নানির প্রতি নাতিদের আলাদা একটা ভালোবাসা থাকে অথচ আমি সেই রাতেও পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত ছিলাম। যখন আমি এই খবরটি শুনতে পাই, আমার বুকের একপাশে খুব কষ্ট অনুভব করি, আমি সাথে সাথে বিছানা থেকে উঠে গোসল করি, গোসল করে ফজরের কাজা নামাজ আদায় করি। তারপর নানুর বাড়ির দিকে রওনা দিই।

 

তারপর আমি নানুর বাড়িতে গেলাম, দেখি নানুর মুখ পশ্চিম দিকে ফিরানো খাটে শুইয়ে রাখা হয়েছে, আমার আম্মু কান্না করতেছে, আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরলো, আমি আম্মুকে শান্তনা দিয়ে কবরস্থানে দিকে চলে গেলাম। ঐখানে অনেকজন কবরের কাজে ব্যস্ত আমি উপর থেকে দেখতে লাগলাম কিভাবে কবর কুড়ে মাঝে মাঝে একটু সাহায্য করলাম। তারপর কবরের কাজ শেষ হলে আমি নানুর লাশের কাছে যাই, নানুকে গোসল করিয়ে উঠানে পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। তারপর অনেক জন মিলে নানুর লাশ কাধে নিলাম আস্তে আস্তে কবরস্থানে নিয়ে গেলাম, নেওয়ার কিছুক্ষন পরে জানাযা হলো জানাযা হওয়ার লাশ কবরে রাখার পালা। যেহেতু লাশ একজন মহিলার তাই মাহরুম ছাড়া কেউ তার লাশ ধরতে পারবে না, আমি যেহেতু নাতি তাই আমি সহ তিনজন কে নামতে হলো কবরে, কবরে লাশ নামানোর পর উপর দিয়ে পর্দা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো উপর থেকে অনেকজন বলতেছিল লাশের বাঁধন খুলে দিতে। কিন্তু উপরে পর্দা থাকার কারনে ভিতরে খুব অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল আমার খুব ভয় করছিল, তবুও আমি নিজেকে সামলিয়ে বাঁধন খুলে দিয়ে দ্রুত উঠে যাই। তারপর উপরে বাঁশ দিয়ে সবাই যার যার মতো মাটি দিয়ে চলে আসে, আমিও চলে আসলাম। দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে আম্মু থেকে গেলো আমি চলে আসলাম। 

 

তারপর আমি বাসায় চলে আসলাম আসার পর আমার মনের ভিতর একটা ভয় থেকেই গেলো, আমাকেও তো একদিন এইভাবে কবরে যেতে হবে, আমি এখন যেই অবস্থায় আছি যেই পাপে লিপ্ত আছি আমার কি হবে। এইসব ভাবতে ভাবতে Instagram ঢুকলাম, Reels দেখার জন্য ঢুকতেই আমার চোখের সামনে একটি Animation Video আসে যেখানে জাহান্নামের একটি চিএ তুলে ধরা হয়, সেখানে দেখানো হচ্ছে ফেরেশতারা কিছু লোকের চোখে ও মুখে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা অথাৎ রট ঢুকিয়ে দিচ্ছে আর ভিডিওটির Background এ কিছু জাহান্নামের কিছু কুরআনের আয়াত শুনা যাচ্ছে, আমি ভিডিও টি দেখে খুব ভয় পেয়ে যাই এবং আমার নিজের অবস্থানের কথা চিন্তা করে আমার চোখে পানি চলে আসে।

 

তারপর আমি তাওবা করি, আমার সোস্যাল মিডিয়াতে যত হারাম জিনিস ছিল সব আমি ডিলেট করে দিই, চিন্তা করতে থাকলাম এইভাবে চলতে থাকলে হবে না, আখিরাতের জন্য হলেও আমার জীবনে পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু পরিবর্তন টা কিভাবে নিয়ে আসবো বুঝতেছিলাম না, কারণ আমি নামাজ পড়তেছি কিন্তু আমার নামাজে কোন মনোযোগ থাকে না, মাঝে মাঝে কত রাকাত পড়লাম ঐটাও ভুলে যাই আজেবাজে চিন্তা আসে নামাজে। তখনই আবু ত্বহা মুহাম্মদ আদনান ভাইয়ের একটা ভিডিও আমার সামনে আসে, তিনি সেই ভিডিওতে বলেন যতখন পর্যন্ত নামাজের অর্থ জানবেন না ততখন পর্যন্ত নামাজে প্রশান্তি পাবেন না, এই কথাটা আমার মাথায় আটকে গেলো তারপর শুরু হলো আমার আল্লাহ দিকে সহিহ ভাবে পথ চলা। তারপর আমি যা করলাম :

 

১. আমি নামাজের শুরুতে ছানার পড়তে হয় ছানার অর্থ শিখলাম এবং ধীরে ধীরে তেলোয়াত করতাম এবং অর্থটা অনুভব করার চেষ্টা করতাম। 

 

২. সূরা ফাতিহাকে আমি নতুন ভাবে আবিষ্কার করলাম, কি মারাত্মক অর্থ, আমি এত বছর শুধু পড়েই গেলাম কিন্তু কখনো চেষ্টা করিনি অর্থ বুঝার তারপর নামাজে এক আয়াত তেলোয়াত করতাম আর অর্থ অনুভব করার চেষ্টা করতাম। 

 

৩. তারপর আমি যেই সূরা গুলো জানতাম সেগুলোর অর্থ মুখস্থ করি, যেহেতু আমি স্কুলের ছাত্র ছিলাম এইতো বেশী সূরা জানতাম না ১০ থেকে ১২ সূরা জানতাম ঐ গুলোর অর্থ গুলো জানার চেষ্টা করতাম। 

 

৪. তারপর যেই কাজটা করি রুকু ও সিজদার তাজবীহ সমূহের অর্থ গুলো মুখস্থ করি, এবং এমন ভাবে নামাজে পড়ার চেষ্টা করি যেন আল্লাহ আমার সামনে আছেন আমি তার কুদরতী পায়ের কাছে সিজদা করছি। 

 

৫. তারপর তাশাহুদ, দূরদে ইব্রাহিম ও দোয়ে মাছূরার অর্থ শিখলাম তখন বুঝলাম আসলে নামাজেই আসলেই একটি দোয়া। আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে দোয়ে মাছূরার অর্থ দেখবেন যখন আপনি এর অর্থ শিখবেন, আপনি এই দোয়ার প্রেমে পড়ে যাবেন। 

 

৬. এইসব শিখতে আমার ২০ থেকে ৩০ দিন সময় লেগেছে। এইসময় আমি রাতে মোবাইল সাথে রাখতাম না, ফজরের নামাজ পড়ার জন্য একটা Alarm ঘড়ি কিনি যাতে মোবাইল আমার সাথে থাকলে আমি আবার সেই পাপ কাজে জড়িয়ে যেতে পারি সেই সন্দেহে।

 

৭. বন্ধু বান্ধব পরিবর্তন করে ফেলি চেষ্টা করতাম যারা নামায পড়ে তাদের সাথে চলাফেরা ।

 

৮. খুব কম কথা বলার চেষ্টা করতাম, কারণ অতিরিক্ত কথা মানুষের ঈমানকে দূবল করে দেয়, চেষ্টা করতাম গাড়িতে, হাটতে, বসতে সবসময় মনে মনে জিকির করতে ।

 

৯. ফজরের নামাজ কাজা হলে যখন ঘুম থেকে উঠতাম সাথে সাথে পড়ে ফেলতাম। 

 

১০. আসর বা মাগরিবের কিছু সময় মসজিদের এক কোণে অন্ধকার জায়গায় প্রতিদিন কিছুক্ষণ সময় জিকির করা চেষ্টা করতাম। 

 

১১. আমি ইউটিউবে অনেক ভিডিও দেখেছি হস্তমৈথুন ও পর্নোগ্রাফি থেকে বাঁচতে তারা দুনিয়াবী পরার্মশ দিয়ে থাকে, আমি সব ব্যবহার করে দেখেছি একমাএ ইসলাম ছাড়া এই পাপ থেকে মুক্তির কোন উপায় নেই। 

 

১২. আমার কিছু হারাম ইনকাম ছিল যেগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম ঐসব ইনকামের পথ আমি ছেড়ে দিয়েছি, কারণ ইবাদত কবুলের পূর্ব শর্ত হচ্ছে হালাল উপার্জন। আপনার যদি থাকে সবার প্রথমে এই কাজটি করবেন, তাহলে নামাজে তৃপ্তি পাবেন, নামাজ পড়তে ভালো লাগবে। 

 

১৩. প্রতিদিন দিনে এক থেকে দুই ঘন্টা উস্তাদ নোমান আলী খান, আবু ত্বহা আদনান, ড. ইসরার আহমেদ সহ আরিফ আজাদের ইউটিউব চ্যানেলের ভিডিও গুলো দেখার চেষ্টা করতাম। 

 

এই হচ্ছে আমার ফিরে আসার গল্প এখন একটি হালাল চাকুরির জন্য চেষ্টা করছি, দ্বীনের জ্ঞান অর্জনে সময় ব্যয় করছি, সামনে ইন শা আল্লাহ দ্বীনদার মেয়ে দেখে বিয়ে করবো। 

 

এই গল্প লিখার আমার একটি মাএ উদ্দেশ্যে হলো আমার এই গল্পের মাধ্যমে যদি কাউকে আল্লাহ হেদায়েত দান কাল হাশরের মাঠে ইন শা আল্লাহ এটাই আমার নাজাতের উছিলা হবে। আমার এই গল্পে যদি আপনার জীবনে বিন্দু মাত্র পরিবর্তন নিয়ে আসে আমার মতো পাপীর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন, আল্লাহ যাতে আমাকে মাফ করে দেয়, যাতে সেই অন্ধকার জগতে আর ফিরিয়ে নিয়ে না যায়।

Comments