সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে

Comments · 16 Views

সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি সামুদ্রিক জীবনের ওপর প্রভাব ফেলছে।

২০২৩ সালকে জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাসে আরেকটি দুর্যোগপূর্ণ বছর বলে মনে করা হয়। সাধারণভাবে মহাসাগরগুলো নিয়মিত তাপ শোষণ করে। পৃথিবীর আহ্নিক গতির জন্য এই তাপ শোষণের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন গবেষণা বলছে, পাঁচ বছর ধরে সমুদ্রের উষ্ণতা ধরে রাখার ক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।

বিষয়টিকে বিশ্বের জলবায়ুর ইতিহাসে একটি উদ্বেগজনক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। চীনের বেইজিংয়ের চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সের ইনস্টিটিউট অব অ্যাটমোস্ফেরিক ফিজিকসের বার্ষিক বিশ্লেষণে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। ৫টি দেশের ১৯টি সংস্থার ৩৪ জন বিজ্ঞানী সম্মিলিতভাবে এ গবেষণা পরিচালনা করেন।

২০১৯ সাল থেকে মহাসাগরগুলো রেকর্ড হারে উষ্ণ হচ্ছে। এ বিষয়ে সমুদ্রবিজ্ঞানী ও গবেষণা দলের প্রধান চেং লিজিং বলেন, এমন ঘটনার জন্য মানুষই বেশি দায়ী। বিভিন্ন কারণে গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মহাসাগরের উষ্ণতা বাড়ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বেশি থাকবে, ততক্ষণ মহাসাগরগুলো শক্তি শোষণ করতে থাকবে। এতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঘটনা চলতেই থাকবে।

২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে সমুদ্রের প্রথম ২ হাজার মিটার এলাকায় সঞ্চিত তাপ ১৫ জেটাজুল (শক্তি পরিমাপের একক) বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর এই মাত্রা ছিল ১০ দশমিক ৯ জেটাজুল। জাপানের হিরোশিমাতে যে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়, তেমন পাঁচ থেকে ছয়টি বোমার সমান তাপ সমুদ্র প্রতিদিন ধারণ করছে।

এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যে লিভারপুলের ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফি সেন্টারের সমুদ্রবিজ্ঞানী স্বেতলানা জেভরেজেভা বলেন, এই প্রবণতা খুবই উদ্বেগজনক। সাগরের উষ্ণায়নের রেকর্ড টানা পঞ্চম বছর ভেঙেছে। সমুদ্রের তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তনও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সমুদ্রের স্তর বৃদ্ধি ও উষ্ণতার কারণে সমুদ্র প্রসারিত হচ্ছে। সমুদ্রের দ্রুত উষ্ণতা চরম আবহাওয়ার মতো বিষয়গুলোকে তীব্র করে তুলছে। মহাসাগরগুলো বিশ্বব্যাপী আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে। বৃষ্টি, খরা ও বন্যার মতো বিষয়গুলোর চক্র ভেঙে যাচ্ছে।

কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক পরিবেশবিদ উইলিয়াম চেউং বলেন, সমুদ্রের উষ্ণতা সামুদ্রিক জীবনের ওপর প্রভাব ফেলছে। উষ্ণ মহাসাগর সামুদ্রিক নানা প্রজাতির প্রাণীর প্রজনন ও পরিযায়ী চক্রকে পরিবর্তন করছে। ফলে বিভিন্ন প্রাণীর আকারেও প্রভাব ফেলছে। নিউজিল্যান্ডের ডানেডিনের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবিজ্ঞানী ক্রিস্টিনা হুলবে বলেন, যত দিন বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বাড়বে, তত দিন বায়ুমণ্ডল ও মহাসাগর উভয়ই উষ্ণ হতে থাকবে। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করতে পারলে উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রবণতা পরিবর্তন হবে। খুব দেরি হওয়ার আগে উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণ বন্ধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ পুরোটাই বরফ-সমুদ্রে আচ্ছাদিত। রহস্যময়ী অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশকে ঘিরে রেখেছে অ্যান্টার্কটিক মহাসাগর বা সাউদার্ন ওশেন। সেই মহাসাগরের বরফ নতুন করে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে বিজ্ঞানী ও জলবায়ু গবেষকদের। স্যাটেলাইটের তথ্য জানাচ্ছে, এবারের শীতে সবচেয়ে কম বরফ দেখা যাচ্ছে অ্যান্টার্কটিক মহাসাগরে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল স্নো অ্যান্ড আইস ডেটা সেন্টারের গবেষক ওয়াল্টার মেইয়ার বলেন, ‘আমরা আগে এমনটি কখনই খেয়াল করিনি। আমার নতুন তথ্যে বিস্মিত হচ্ছি। অ্যান্টার্কটিকার অস্থিতিশীল আবহাওয়া পুরো পৃথিবীর ওপরে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। এটার পরিণতি ভালো হওয়ার সুযোগ নেই।  আমাদের এই গ্রহকে অ্যান্টার্কটিকা বরফ শীতল রাখে বলেই পৃথিবী রেফ্রিজারেটর থেকে রেডিয়েটরে রূপান্তরিত হতে পারছে না। অ্যান্টার্কটিক মহাসাগর পৃষ্ঠে ভাসমান বরফের আকার বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ বর্গ কিলোমিটার। এ বছরের সেপ্টেম্বরে বরফের আয়তন কমেছে প্রায় ১৫ লাখ বর্গ কিলোমিটার। এক কথায় বলা যায়, বাংলাদেশের আয়তনের ১০ গুণ বেশি বরফ হারিয়ে গেছে অ্যান্টার্কটিকায়।’

বিশ্বের তাপমাত্রার ওপরে অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফের প্রভাব রয়েছে। অ্যান্টার্কটিকার সাদা বরফের আস্তরণ সূর্যের আলোক শক্তিকে প্রতিফলনের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে ফিরিয়ে দেয়। আবার এই বরফ সমুদ্রের নিচের পানিকে শীতল করে রাখে। বিজ্ঞানীরা এখন বরফ কমে যাওয়ার কারণ চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন। এটা আসলেই রহস্য বলে মনে করছেন তাঁরা। অ্যান্টার্কটিকার নানা তথ্যাদি এমনি সংগ্রহ করা চ্যালেঞ্জিং বলে রহস্য বাড়ছে। ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী রবি ম্যালেট বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, পুরো পরিস্থিতি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২৩ সালে যখন বৈশ্বিক তাপ ও সমুদ্রের তাপমাত্রার রেকর্ড হচ্ছে, সেখানে সমুদ্রের বরফের দিকে মনোযোগ না দিলে আরও বিপদ বাড়বে বলা যায়। অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের জলবায়ুকে বিশ্লেষণ করে এমনটাই শঙ্কা করা হচ্ছে।’

বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা প্রচণ্ড ঠান্ডা ও শক্তিশালী বাতাসের কারণে এই বছরের সমুদ্রের বরফ নিয়ে তথ্যাদি সংগ্রহে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। জলবায়ু গবেষণা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা নিয়ে ম্যালেট বলেন, ‘বরফের আস্তরণ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক। আমাদের সমুদ্রে ভেসে যাওয়ার অনেক ঝুঁকি রয়েছে। কিছু এলাকার সামনের অংশে খুব পাতলা সামুদ্রিক বরফ দেখা যায়, যা নিলাস নামে পরিচিত। এই পাতলা বরফে আস্তরণ কম বাতাসময় পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে কাজ করা অনেক কঠিন।’

সামুদ্রিক বরফ মহাদেশের শীতকালে তৈরি হয়। মার্চ থেকে অক্টোবর সময় পর্যন্ত বরফ বিস্তৃত হয়। সাগর আর স্থলের বরফের মাধ্যমে বিশাল একটি ইকোসিস্টেম রয়েছে। সামুদ্রিক বরফ অ্যান্টার্কটিকার ভূমিকে ঢেকে রাখে। এটা প্রতিরক্ষামূলক হাতের মতো কাজ করছে। এই সামুদ্রিক বরফ সমুদ্রকে উত্তপ্ত হতে বাধা দেয়। ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভে দলের বিজ্ঞানী ক্যারোলিন হোমস বলেন, ‘আমাদের অনেক অনেক কারণ আছে দুশ্চিন্তার, কিন্তু সমাধানের উপায় কোথায়? ১৯৯০ সাল থেকে এযাবৎ বরফ হারিয়ে অ্যান্টার্কটিকার কারণে সমুদ্রের উচ্চতা বেড়েছে ৭.২ মিলিমিটার। ২০২২ সালের মার্চে সেখানকার তাপমাত্রা থাকার কথা—৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কিন্তু দেখা যায়—১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সামুদ্রিক বরফ সংকুচিত হওয়ার প্রভাব গ্রীষ্মের সময় আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই। প্রতিটি গ্রীষ্মেই এখন বরফ গলে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া বেশ গভীরভাবে দেখা যাচ্ছে। যত বেশি সামুদ্রিক বরফ অদৃশ্য হচ্ছে ততই সমুদ্রের অন্ধকার অঞ্চল উন্মুক্ত হচ্ছে। বরফ-সমুদ্র সূর্যালোককে প্রতিফলিত করার কাজ করে। এখন সেখানে বরফ না থাকার কারণে সূর্যের শক্তি শোষণ করছে সমুদ্র। সমুদ্রের উষ্ণতা বাড়ার কারণে আরও বরফ গলে যায়। একে আইস-অ্যালবেডো প্রভাব বলে।’

Comments